সিলেটে সাংবাদিক অপহরণ ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা! | তদন্ত রিপোর্ট

শুক্রবার, ১০ Jul ২০২৬, ০৬:২৬ অপরাহ্ন

সিলেটে সাংবাদিক অপহরণ ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা!

সিলেটে সাংবাদিক অপহরণ ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা!

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক: সীমান্তবর্তী জেলা সিলেটে চোরাচালান, ছিনতাই এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তার এক ভয়াবহ ও জলজ্যান্ত প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর অপহরণের ঘটনায়। চোরাকারবারিদের মুখোশ উন্মোচন এবং সাহসিকতার সাথে সংবাদ প্রকাশের জেরে ‘জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোঃ রায়হান হোসেনকে কেবল অপহরণই করা হয়নি, বরং তার পরিবারকে চরম মানসিক ও শারীরিক হুমকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লার দেবিদ্বার থানা পুলিশের সহায়তায় এই সাংবাদিক নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসলেও, নিজ এলাকা সিলেটের শাহপরান থানা পুলিশের বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা গোটা সাংবাদিক সমাজ ও সচেতন নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

Manual6 Ad Code

এই রোমহর্ষক ঘটনার পটভূমি রচিত হয় গত ১৪ মে, ২০২৬ তারিখে। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশু ক্রয়ের উদ্দেশ্যে সাংবাদিক রায়হান হোসেন সিলেটের জৈন্তাপুর থানাধীন চিকনাগুলে যান। সেখানে পছন্দমতো গরু না পেয়ে বাড়ি ফেরার পথে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। তার গতিরোধ করে অস্ত্রের মুখে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনার পর তিনি আইনের আশ্রয় নেন এবং গত ১৯ মে জৈন্তাপুর মডেল থানায় জুয়েল আহমদসহ অজ্ঞাতনামা ৩ জনের বিরুদ্ধে ৩৯২ ধারায় একটি দস্যুতার মামলা (মামলা নং ১১) দায়ের করেন। পুলিশের তদন্ত ও আসামি জুয়লকে রিমান্ডে নেওয়ার পর বেরিয়ে আসে ভয়ংকর এক সত্য। জানা যায়, এই ছিনতাইয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছে তার এলাকার আক্তার, রুবেল এবং তাদের সহযোগী এক সিএনজি চালক। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এই আক্তার এবং রুবেল সাধারণ কোনো অপরাধী নয়; তারা মূলত হরিপুর এলাকার চিহ্নিত ও কুখ্যাত চোরাকারবারি মঈনুলের বিশ্বস্ত ‘লাইনম্যান’ এবং বেতনভুক্ত ভাড়াটে ক্যাডার। একদিকে রায়হানের ছিনতাই মামলায় তাদের নাম জড়িয়ে পড়া এবং অন্যদিকে তাদের চোরাচালান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পত্রিকায় ধারাবাহিক ও নির্ভীক সংবাদ প্রকাশ এই দুইয়ে মিলে চোরাকারবারি সিন্ডিকেট সাংবাদিক রায়হানের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে অপরাধী চক্রটি গত ৩ জুলাই (শুক্রবার) দুপুরে সাংবাদিক রায়হানের পরিবারের ওপর প্রথম সরাসরি আঘাত হানে। প্রকাশ্য দিবালোকে আক্তার হোসেন (৩৬) রায়হানের মাত্র ৬ বছর বয়সী শিশুপুত্র সাইফুল ইসলাম রাতুলকে রাস্তায় আটকে ফেলে। অবুঝ এই শিশুটির সামনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে আক্তার হুমকি দেয় যে, তার বাবা সাংবাদিক রায়হানকে খুব দ্রুতই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং শিশুদের গুম করে ফেলা হবে।

এই ভয়াবহ হুমকির পর থেকে ৬ বছরের শিশু রাতুল চরম মানসিক ট্রমা (Post-Traumatic Stress Disorder) বা ভীতির শিকার হয়েছে। গত আট দিনের বেশি সময় ধরে ভয়ে সে ঘর থেকে বের হতে পারছে না, এমনকি তার নিয়মিত মসজিদ-মাদ্রাসায় যাওয়াও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে রায়হানের বৃদ্ধা মা গত ৪ জুলাই শাহপরান (রহ.) থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ১৪৬) দায়ের করেন। কিন্তু রহস্যজনকভাবে, জিডি হওয়ার পরও পুলিশ আসামিদের বিরুদ্ধে টিকিটিও স্পর্শ করেনি।

Manual7 Ad Code

শাহপরান পুলিশের এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের জন্য যেন গ্রিন সিগন্যাল হিসেবে কাজ করে। তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গত ৭ জুলাই দিবাগত গভীর রাতে, ঘড়ির কাঁটায় তখন আনুমানিক ১:৩৭ মিনিট, ছিনতাই মামলার ২নং আসামি সুকৌশলে মোবাইল ফোনে কল করে সাংবাদিক রায়হানকে জরুরি আলাপের কথা বলে ঘরের বাইরে ডেকে নেয়। রায়হান সরল বিশ্বাসে বাইরে আসামাত্রই আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা আক্তার হোসেনের নেতৃত্বে ৩-৪ জনের একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাকে ঘিরে ধরে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে জোরপূর্বক একটি কালো রঙের মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে গাড়িটি সিলেট সীমান্ত ছাড়িয়ে ছুটে চলে এক অজানা গন্তব্যে, যেখানে অপেক্ষা করছিল নিশ্চিত মৃত্যু।

গাড়িটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাত গড়িয়ে যখন কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ‘চরবাকার’ নামক এক নির্জন স্থানে পৌঁছায়, তখন অপহরণকারীরা কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে গাড়ি থামিয়ে চা পানের জন্য নিচে নামে। আর এই সামান্য অসতর্কতার সুযোগটিই কাজে লাগান সাংবাদিক রায়হান। চরম সাহসিকতা ও উপস্থিত বুদ্ধির জোরে তিনি গাড়ি থেকে লাফিয়ে অন্ধকারে পালিয়ে যান। স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি দ্রুত কুমিল্লার দেবিদ্বার থানা পুলিশের দ্বারস্থ হন। দেবিদ্বার থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং পুলিশের কড়া পাহারায় তাকে পুনরায় সিলেটে তার পরিবারের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে এসে ন্যায়বিচারের আশায় গত ৮ জুলাই শাহপরান থানায় আক্তার হোসেন, হায়দার মিয়াসহ অজ্ঞাতনামা ৩-৪ জনের বিরুদ্ধে একটি আনুষ্ঠানিক এজাহার দায়ের করেন রায়হান হোসেন। কিন্তু এখানে এসেই তিনি সম্মুখীন হন চরম হয়রানির। ভুক্তভোগীর পরিবারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়ার পর বেশ কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ মামলাটি এফআইআর (FIR) হিসেবে রেকর্ড করেনি বা কোনো প্রাথমিক তদন্তও শুরু করেনি। রায়হান নিখোঁজ থাকার সময় তাকে উদ্ধারের জন্য তার বৃদ্ধা মা শাহপরান থানায় ছুটে গেলে, থানার ওসি ছুটিতে থাকার অজুহাতে পরিদর্শক (তদন্ত) অজ্ঞাত কারণে তাকে দিনভর থানায় বসিয়ে রেখে মানসিক হয়রানি করেন। সাংবাদিক রায়হান দৃঢ়ভাবে আশঙ্কা করছেন যে, সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের সাথে থানার কতিপয় অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন ও গভীর সখ্য রয়েছে। যে কারণে আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে।

Manual2 Ad Code

এই ঘটনা প্রসঙ্গে দুই থানার পুলিশের বক্তব্যে বিস্তর ফারাক, দেবিদ্বার থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে জানান, “সিলেট থেকে অপহৃত ওই সাংবাদিক আমাদের এলাকায় গাড়ি থামানোর সুযোগে সুকৌশলে পালিয়ে যান এবং আমরা তাকে উদ্ধার করে নিরাপত্তা দিই। যেহেতু অপহরণের মূল ঘটনাস্থল সিলেটের শাহপরাণ থানা এলাকা, তাই আইন অনুযায়ী মামলা সেখানেই রুজু হতে হবে। তবে আমরা তাকে নিরাপদে সিলেটে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছি। অন্যদিকে, শাহপরাণ থানার ওসি ছুটিতে থাকায় দায়িত্বরত পরিদর্শক (তদন্ত) মনজুরুর রহমান মামলা না নেওয়ার খোঁড়া যুক্তি হিসেবে প্রযুক্তির দোহাই দিয়েছেন। তিনি বলেন, “গতকাল সার্ভার ত্রুটির কারণে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আজ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।” ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে একটি স্পর্শকাতর অপহরণ মামলায় ‘সার্ভার ত্রুটি’র অজুহাতে কালক্ষেপণ করাটি সচেতন মহলের কাছে পুলিশের চরম অপেশাদারিত্ব ও দায়িত্বহীনতা হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

বর্তমানে সাংবাদিক মোঃ রায়হান হোসেন এবং তার পরিবার চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে নিজ বাড়িতে একপ্রকার গৃহবন্দি জীবনযাপন করছেন। তাদের স্বাভাবিক চলাফেরা, সন্তানদের স্কুলে যাওয়া সবকিছুই বন্ধ। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই দুর্ধর্ষ চোরাকারবারি চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তারা পুলিশের আইজিপি (IGP), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। যদি অবিলম্বে এই চক্রের মূলোৎপাটন করা না হয় এবং সাংবাদিক রায়হানের বা তার পরিবারের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি হয়, তবে এরজন্য সম্পূর্ণ দায় এ বাহিনী বলে ভুক্তভোগী পরিবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে।

Manual2 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code
error: Content is protected !!